(মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এর বিশেষ ট্রেনিং ছিল গত ১২/০৫/২০২৫-২৮/০৫/২০২৫ তারিখে। এর ফাঁকে ১৬/০৫/২০২৫ তারিখ শুক্রবারে আমার এই ভ্রমণ। লম্বা লেখাকে আমি ছোট পর্ব আকারে দিলাম। এখানে প্রথম পর্ব)
শুক্রবার সকালে নাস্তা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার জন্য। কোর্সের কারোর মধ্যে যেন আগ্রহ নাই, একটা ছন্নছাড়া ভাব। আমার হোমওয়ার্ক করেই রাখছি। নাস্তা শেষে আস্তে-ধীরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গেলাম রিসেপশনে বসা লোকটার দিকে। জিগাইলাম, সোনারগাঁ কোন দিকে ? সে যা বললো তাতে বুঝলাম গেট দিয়া বাইর হইয়া রাস্তা পার হইলে বাস আছে। ব্যস, আমার জন্য এইটুকু জানাই যথেষ্ঠ।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজে আসছি তিন সপ্তাহের ট্রেনিংয়ে। এখানে এসেই আমার স্বভাবমতো শুরু করলাম “ভাঙ্গা বাড়ি” i mean জমিদার বাড়ি বা নবাব বাড়ি টাইপের পুরাতন বাড়ি খোঁজা। অনেক ঘাটাঘাটি করে যা পেলাম, গজারিয়ার ফুলদী নামক স্থানে সাহেব বাড়ি নামে একটা কিছু আছে, কিন্তু এই সাহেব বাড়ির বিষয়ে এখানের কেউই ধারণা দিতে পারলো না, তার উপর ম্যাপে দেখলাম ফুলদী জায়গাটা ভালোই দূরে।
রুম বয় বা আশেপাশে যাকেই জিজ্ঞেস করি সবাই সাজেস্ট করে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে যেতে। গজারিয়া থেকে অবশ্য সোনারগাঁ বেশ কাছে, মাত্র ১৫ কিমি এর মতো। সোনারগাঁয়ে আমি এর আগে একবার গেছি, ২০০৫/২০০৬ এর দিকে, কলেজ এর স্টাডি ট্যুরে। কিন্তু কেন জানি এবার মন তেমন টানছিল না সোনারগাঁয়ে যেতে।
রুম থেকে বের হইছিলাম সকাল সাড়ে নয়টায়, আর ফিরছি রাত আটটায়। অর্থাৎ আমার এই সলো ঘোরাঘুরি প্রায় সাড়ে ১০ ঘন্টা। ঐতিহাসিক কোন জায়গা দেখার জন্য আমি কেমন বেপরোয়া হতে পারি সেইটা আমার তাজিকিস্তানের বন্ধু হিমুইদ্দিন এর চেয়ে আর কে ভালো জানে! পরিশিষ্ট-১ এ সংক্ষেপে উল্লেখ করলাম ঘটনাটা।
সোনারগাঁ একটা ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ জায়গা এটা সবাই জানে। কিন্তু লোকশিল্প জাদুঘর আর পানাম নগরী সবাই দেখে, শুধু এই দুইটা স্পটে আকর্ষন পাচ্ছিলাম না। তাই প্ল্যান করলাম আশেপাশে আরো কিছু থাকলে তা দেখতে হবে।
(এখানে আগেই বলে রাখি, শেষ পর্যন্ত যে জায়গাগুলা কভার করেছি আমার ট্যুরে তা হলোঃ
১। লোকশিল্প জাদুঘর (বড় সর্দার বাড়ি, জাদুঘর, কারুপল্লী)
২। পানাম নগর
৩। গোয়ালদি মসজিদ (গায়েবি মসজিদ)
৪। পাঁচ পীরের দরগাহ
৫। সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর সমাধি (কালা দরগাহ)
অধিকাংশ মানুষ প্রথম দুইটা জায়গা দেখে ফিরে আসে। বাকিগুলো দেখতে হইলে একটু কষ্ট করতে হবে, সময় ম্যানেজ করতে হবে এবং আগ্রহ থাকতে হবে।)
সকালে সাড়ে ৯ টায় আমি বাসে উঠলাম। পাখির মোড় থেকে মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত মিনিবাস যায়, ৪০ টাকা ভাড়া। সময় লাগছে প্রায় ৪৫ মিনিট। এইবার রাস্তাটা পার হইয়া সাইড রাস্তা দিয়া রিজার্ভ অটো নিলাম ৪০ টাকায়, সোনারগাঁ জাদুঘরে যাওয়ার জন্য । শেয়ারে গেলে ২০ টাকা নিবে। কিন্তু বাসে থাকতেই মেজাজ খারাপ করা বৃষ্টি নেমে পথ-ঘাট কাদা বানাইয়া দিছে।
লোকশিল্প জাদুঘরের গেইটে টিকেট কাটলাম। এন্ট্রি ফি ৫০ টাকা, আর বড় সর্দার বাড়ি দেখতে চাইলে আরো ১০০ টাকার টিকেট লাগবে। আমি ১৫০ টাকা দিয়ে নিলাম দুইটা ভেনুর টিকেট। ঢুকতে ঢুকতে ১১ টার কাছাকাছি বেজে গেছে।
গেট দিয়ে ঢুকতেই যে রাজকীয় বাড়িটা চোখে পড়ে সেইটা বড় সর্দারবাড়ি। বাড়ির সামনের পুকুরের পাশ দিয়ে গিয়ে দূর থেকে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় এই বাড়ির সৌন্দর্য। চলে গেলাম বড় সর্দারবাড়িতে ঢোকার গেইটে।

বড় সর্দারবাড়ির সামনের অংশ ।
বড় সর্দারবাড়িটা আসলে মোঘল আমলে বানানো একটা রাজবাড়ি বলা যায়। কলেজে থাকতে যখন আসছিলাম তখন সম্ভবত এটাই ছিল জাদুঘর। পরে জাদুঘরটা আলাদা ভবনে স্থানান্তর করা হয়। বড় সর্দারবাড়ির সংস্কার শেষে তা এখন অপূর্ব চেহারায় ফিরেছে। এটার ভিতরে অনেক নাটক, মিউজিক ভিডিওর শুটিং হয়েছে।

পুকুর ঘাটের ভাষ্কর্য।
এই বাড়ির দুইটা অংশ, সামনের অংশের উঠান পার হয়ে পেছনের অংশের উঠানে যেতে হয়। বাড়ির সামনে সান বাধানো পুকুর ঘাট, ভিতরের রুমগুলোতে লোকজ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে সাজানো।

সর্দারবাড়ির পুকুর পাড়ের এক জায়গা এমনভাবে সাজানো।
আপনি যখন পুরো বাড়িতে হেঁটে বেড়াবেন তখন কল্পনা করবেন বাংলার কোন এক সম্ভ্রান্ত সামন্তের বাড়ির মধ্যে হেঁটে যাচ্ছেন। এই বুঝি এক কোণ থেকে হাঁক দিয়ে উঠলো কেউ।

বাড়ির ভিতরটা যা সুন্দর না !

বাড়ির প্রথম অংশের আঙ্গিনা ।
বড় সর্দারবাড়িতে ৩০ মিনিট থাকতে দেয়, নিয়ম অনুযায়ী। কিন্তু এরা মনে হয় বিষয়টা খুব কেয়ার করে না। আবার সেদিন লোকজন কম ছিল। কয়েকজন বিদেশীকে দেখলাম গাইডসহ ঘুরে দেখছে। বাড়ির পেছনে আরেকটা পুকুর আছে। এই পুকুরের ঘাটে বসে দেখলাম পানকৌড়ির মাছ ধরার দৃশ্য। কি অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ!

আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে পিলারে হেলান দিয়ে শুধু দেখতেই মন চায় ।
বাড়ির বাইরের এক পাশে সবুজ আবহে সুন্দর ডেকোরেশন করা হয়েছে। ঐদিকে আবার ওয়াশরুমও আছে। ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন।

ম্যালা দিন পর আমার ট্যুর গেটআপে। ব্যাখ্যা পরিশিষ্ট-২ এ।
বড় সর্দারবাড়িতে একটু বেশি সময় কাটাই আমি। কারণ, বের হয়ে গেলে টিকেট ছাড়া আর ঢোকা যাবে না। পুকুর ঘাটে ছায়ায় একটু বসি। কল্পনা করি চার-পাঁচশ বছর আগে এই বাড়িটা কেমন ব্যস্ত থাকতো !
পরিশিষ্টঃ
১। ২০২২ সালে ভারতের তামিলনাড়ুর মাহাবালিপুরমে সলো ট্রিপের প্ল্যান করছিলাম। লুকাইয়া গেইট দিয়া বাইর হওয়ার সময় মালাউয়ির জ্যানেট আর ইথিওপিয়ার বেটি আমারে পাকড়াও করে পিছু নিলো। এরপর এই ঘাউরা হিমুইদ্দিন কই থেইকা আইসা যোগ দিলো আমাদের সাথে। সে আসলে বুঝে নাই আমি কত বড় “সাইকো ট্রাভেলার”! প্রচন্ড গরমে আর অতিরিক্ত ঘামে যখন তার পায়ের মাসল রেসপন্স করা ছাইড়া দিছিলো সেই মূহুর্ত ভাবলে নিজেরে আজও অপরাধী লাগে।
২। ট্যুরে আমার গেটআপ প্রায় সময় একই থাকে। এগুলা ফ্যাশন না, প্রয়োজনীয়তা। অচেনা জায়গার ট্যুর কষ্টসাধ্য। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকতে পারে, যাতায়াতের মাধ্যম ভিন্ন হতে পারে, বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সাথে এক বোতল পানি রাখা উচিত এবং নিয়মিত পান করা উচিত। হালকা একটা ব্যাকপ্যাকে ছাতা, পানির বোতল , এক প্যাকেট বিস্কিট আর প্রয়োজনীয় জিনিস রাখি। সানগ্লাস বাধ্যতামূলক, তীব্র রোদ আর ধুলা থেকে বাঁচার জন্য। মাথার চুলের সুরক্ষার জন্য ক্যাপ। আরামদায়ক পোশাক হিসেবে পোলো টি-শার্ট, জিন্স/গ্যাবার্ডিন; আর ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটার জন্য স্নিকার টাইপের কাপড়ের জুতা।

Leave a Reply